(দুই)
করোনা (২০১৯) ভাইরাসের রূপভেদ
এখানে, ভাইরাসের রূপভেদ কীভাবে তৈরি হয় সে নিয়ে প্রাথমিক একটা জানাবোঝা থাকা প্রয়োজন। করোনা বা এই ধরনের রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (আরএনএ) ভিত্তিক ভাইরাসগুলি বেশ দ্রুত নিজেদের প্রচুর প্রতিলিপি তৈরি করে তার প্রতিপালক বা হোস্ট-এর কোষের মধ্যে। আবার ওই কোষগুলির মধ্যে ঢোকার সময় থেকেই প্রতিপালকের শরীর নানা রকম ভাইরাস-বিরোধী নিঃসরণ শুরু করে। সেগুলিকে ভাইরাস প্রতিহত করতে থাকে এবং একইসাথে নিজের প্রতিলিপিও গঠন করতে থাকে। ভাইরাস এইভাবে তার দেহের জিনসারণী-র প্রতিলিপি গঠনের সময় কিছু না কিছু ভুল করতে থাকে। জিন তৈরি হয় প্রোটিন দিয়ে। ২০১৯ সালের কোভিড ভাইরাসটির (আদি উহান ভাইরাস) এই জিন-সারণীটিকে, যা প্রায় তিরিশ হাজারের মতো রাসায়নিক একক (নিউক্লিওটাইড) দিয়ে তৈরি, তাকে কাঠামোগত এবং কার্যগতভাবে কিছু মোটাদাগের ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন, ওপেন রিডিং ফ্রেম, স্পাইক (এস), এনভেলোপ (ই), মেমব্রেন (এম), নিউক্লিওক্যাপসিড (এন)। এগুলিকে আলাদা আলাদা প্রোটিন বলা যেতে পারে। স্পাইক আবার কাঠামোগতভাবে দুই ভাগ যাদের মধ্যে একটি জোড় (ক্লিভেজ)-এর জায়গা থাকে। এগুলি নিয়ে আবার পরে আরেকটু আলোচনা করা যাবে, যদিও এখানে খুবই ওপর ওপর আলোচনা করা হচ্ছে। আদতে এগুলি খুবই জটিল প্রক্রিয়া, এমনকি বর্ণনা হিসেবেই।
এই গোটা কাঠামোটিকে প্রতিলিপি করতে গিয়েই ভুলভাল করে পরিব্যক্তি বা মিউটেশন বয়ে আনে ভাইরাস। অবশ্য এই কোভিড-২ ভাইরাসটি প্রতিলিপি করার পর একবার চেক করে যে ঠিকঠাক হল কি না, অনেকটা প্রুফ রিডিং-এর মতো; সেই জন্য এর পরিব্যক্তি-র হার সাধারণ ফ্লু ভাইরাস, যে কিনা চেক করে না এইভাবে, তার চেয়ে একটু কম। এই হিসেবগুলো অবশ্য অতিমারির শুরুতেই পাওয়া সম্ভব ছিল না, কিছুদিন যাওয়ার পর যখন সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আণবিক পরিবর্তনগুলি চেহারা নিয়ে হাজির হতে শুরু করল, পরিভাষায় ফাইলোডায়নামিক থ্রেশোল্ড পেরোলো গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে, তখনই সম্ভব হল এইসব হিসেব পাওয়া (Duchene et al 2020)। প্রথম যে পরিব্যক্তি-টির সন্ধান পাওয়া গেল, সেটা D614G। এই যে D614G — এখানে ডি এবং জি হল অ্যামিনো অ্যাসিডের সংক্ষিপ্ত নাম, যথাক্রমে অ্যাস্পারটিক অ্যাসিড ও গ্লাইসিন। আর 614 হল জিনসারণীর প্রোটিনের কাঠামোগত একক অ্যামিনো অ্যাসিডের স্থানাঙ্ক। অর্থাৎ কোভিড-২ ভাইরাসের প্রথম পরিব্যক্তি যেটা পাওয়া গেল জিনসারণীর স্পাইক বা গজাল অংশের প্রোটিনকাঠামোর একক স্থানাঙ্ক ৬১৪ -তে অ্যাস্পারটিক অ্যাসিডের বদলে গ্লাইসিন আসা। শুধু যে একটি অ্যাসিডের পরিবর্তে আরেকটি আসে (সাবস্টিটিউশন বা প্রতিস্থাপন) তা নয়, অনেক সময় স্থানাঙ্কটি মুছেও (ডিলিশন বা অপনয়ন) যায় পরিব্যক্তিতে। যাই হোক, এই ৬১৪ স্থানাঙ্কে প্রতিস্থাপনটি দেখতে পাওয়া গেল যখন, সেটা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। দেখা গেল, তাই বলা হচ্ছে পাওয়া গেল। জীববিজ্ঞানের গবেষণায় বা জীববিজ্ঞানে এই আলাদাভাবে দেখা পাওয়া এবং তার গঠনগত বর্ণনা, এই দুটিই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
যাই হোক, এটি ভাইরাসটিকে প্রতিপালকের শরীরের কোষের ওপর আরও ভালোভাবে গেঁড়ে বসতে সহায়তা করল। দেখা গেল, এই পরিব্যক্তি থাকা ভাইরাসের শ্বাসনালীতে প্রতিলিপি তৈরি করার হারও বেশি (আরটিপিসিআর টেস্ট-এ সিটি ভ্যালু কম দিয়ে বোঝা গেল)। উহানের বন্য ভাইরাসটির এতাবৎ সারা দুনিয়ায় যত ভ্যারিয়েন্ট বা রূপভেদ পাওয়া গেছে, তার প্রায় প্রতিটিতেই এই প্রাথমিক পরিব্যক্তিটি মিলেছে। অর্থাৎ, বোঝা গেল, ভাইরাসের যে সমস্ত রূপভেদে এই গেঁড়ে বসার পরিব্যক্তিটি নেই, সেগুলি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অন্ততঃ মানুষের শরীরে সংক্রমণের থেকে। এই পরিব্যক্তিগুলির নানা সমাহার নিয়ে তৈরি হল আদি ভাইরাসটির নানা সন্তানসন্ততি। সেই সন্তানসন্ততিদের মধ্যে সামান্য কিছু বাঁচল এবং প্রতিপালক জগতে (মনুষ্যসমাজে) ছড়িয়ে পড়তে পারল ভালোভাবে। সাধারণভাবে ভাইরাসের সন্তানসন্ততীদেরই ভ্যারিয়েন্ট বা রূপভেদ বলা হয়। ২০২১ এর এপ্রিল মাস অবদি সার্স-কোভ-২ বা কোভিড-২ বা কোভিড-১৯ বা আদি উহান ভাইরাসটির জিনসারণীর শুধু গজাল বা স্পাইক প্রোটিন অংশের ১২৭৩ টি অ্যামিনো অ্যাসিড স্থানাঙ্কে পরিব্যক্তি ও ভাইরাসটির সওয়া চার লক্ষ সন্তানসন্ততিদের জিনসারণী ডেটাবেস-এ সেই স্থানাঙ্কগুলির পরিব্যক্তিগুলির পরিমাণ একটি চার্ট-এ দেওয়া হল (ছবি – ১)।

ছবি -১ : Harvey et al 2021; https://doi.org/10.1038/s41579-021-00573-0 থেকে নেওয়া যা ১ জুন প্রকাশিত হয়। এতে দেখা যায়, মূল সার্স-কোভ-২ (২০১৯ এ চিনের উহান-এ পাওয়া) ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিডের ১২৭৩ টি স্থানাঙ্কেরর মধ্যে ১২৬৭ টি স্থানাঙ্কে মোট ৫১০৬ টি প্রতিস্থাপন পরিব্যক্তি। এছাড়াও আছে অপনয়ন পরিব্যক্তি।
ভাইরাসের জিনের কোন পরিব্যক্তিটি নির্বাচিত হবে, তা ঠিক হয় নানা স্তরে। প্রাথমিক স্তর হল হোস্ট বা প্রতিপালকের কোষ এবং দেহ। যেহেতু কোষে ঢোকার সময় থেকেই ভাইরাসবিরোধী কার্যকলাপ শুরু হয়ে যায় প্রতিপালকের শরীরে এবং কোষে, তাই সেই ভাইরাসবিরোধী কার্যকলাপের হাত থেকে বেঁচে যায় যে ভাইরাস-প্রতিলিপিগুলি সেগুলি প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়। তাই কোন পরিব্যক্তিটি টিঁকে যাবে তা নির্বাচনে প্রতিপালকের শরীরের প্রতিরোধী কার্যকলাপের ভূমিকা রয়েছে। পরিব্যক্তি নির্বাচনের প্রাথমিক স্তর যদি হয় প্রতিপালকের কোষ এবং দেহ, তাহলে দ্বিতীয় স্তর হল এক প্রতিপালক দেহের থেকে আরেক প্রতিপালকের দেহের মধ্যে ছড়ানোর প্রক্রিয়া। তা যে সমস্ত পরিব্যক্তিগুলি ভাইরাসটিকে প্রতিপালকের কোষের ওপর গেঁড়ে বসতে সাহায্য করে, প্রতিপালকের দেহের প্রতিক্রিয়া হজম করে নিতে সাহায্য করে, প্রতিপালক কোষে বেশি প্রতিলিপি গঠনে সাহায্য করে, সেগুলির টিঁকে থাকার সম্ভবনা বেশি এই প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরে। এছাড়াও আছে পরিব্যক্তি নির্বাচনে নানা বাইরের হস্তক্ষেপ, যেমন, পরিবেশ ইত্যাদি বা আমাদের মাস্ক, সামাজিক দূরত্ব, লকডাউনের মাধ্যমে প্রতিপালক থেকে প্রতিপালকে ছড়ানোয় হস্তক্ষেপ প্রভৃতি। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে সিঙ্গাপুরে একগুচ্ছ অপনয়ন পরিব্যক্তি দেখা যায় বেশ কিছু সার্স-কোভ-২ ভাইরাস-জিনসারণীতে, ওপেন রিডিং ফ্রেম অংশে; এই পরিব্যক্তির ফলে ভাইরাসটির সংক্রমণ মৃদুতর হচ্ছে বলে দেখা যায়; কিন্তু সিঙ্গাপুরে কড়া লকডাউনে এই পরিব্যক্তি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
যাই হোক, প্রতিপালকের শরীরের মধ্যে ভাইরাসবিরোধী কার্যকলাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই নির্বাচনে, এবং তা শুধু কোষের মধ্যের সহজাত প্রতিক্রিয়া নয়, আমাদের শরীরের আগাম প্রতিরোধ ক্ষমতা বা সংক্রমণ পূর্ববর্তী অনাক্রম্যতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পরিব্যক্তি নির্বাচনে। তাই প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অনাক্রম্যতার রকমফের যেমন শরীরের সাধারণ কাঠামোর ওপর বা সুস্থতার ওপর নির্ভর করে, তেমনি নির্ভর করে একই ধরনের ভাইরাসের (এক্ষেত্রে করোনা ভাইরাসের পুরনো সংস্করণগুলি যা বহুদিন ধরে রয়েছে আমাদের মনুষ্যজগতে) দ্বারা সংক্রমিত হবার বহু পুরনো অভিজ্ঞতাজনিত স্মৃতির ওপর। আবার তা নির্ভর করে এই নয়া করোনা ভাইরাসেরই পুরনো সংক্রমণের অভিজ্ঞতাজনিত স্মৃতি এবং থেকে যাওয়া প্রত্যক্ষ অনাক্রম্যতা বা অ্যান্টিবডির ওপর। টিকার মাধ্যমে ওই পুরনো সংক্রমণের অভিজ্ঞতার একটি নকল তৈরি করা হয় শরীরে। টিকা বানানো হয় ভাইরাসের শরীরের এক বা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ দিয়ে। প্রতিপালকের শরীরে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে (বা মুখ দিয়ে) ভাইরাসের সেই শরীরাংশের একটি প্যাকেজ ঢুকিয়ে প্রতিপালকের শরীরে একটি নকল অভিজ্ঞতা তৈরি করা হয়। তাতে প্রতিপালকের শরীরে ভাইরাসের সেই শরীরাংশের প্রত্যক্ষ অনাক্রম্যতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, এবং স্মৃতি কোষও তৈরি হতে পারে। তবে সবরকমের ভাইরাসের সংক্রমণের অভিজ্ঞতাজনিত স্মৃতির প্রতিক্রিয়া একইরকম হয় না। যেমন, হাম অসুখটির ক্ষেত্রে ভাইরাসটির একবার আমাদের দেহে সংক্রমণ হলে সাধারণতঃ সারাজীবন আর সংক্রমণ হয় না, এমনই অনাক্রম্যতা তৈরি হয়ে যায় শরীরে। ফলে এর টিকা তৈরিও সহজ। আবার ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার সংক্রমণ বেশি অভিঘাত তৈরি করে শরীরে, অর্থাৎ সেক্ষেত্রে প্রথম সংক্রমণের অভিজ্ঞতা বা স্মৃতি সংক্রমণের ভয়াবহতা বাড়ায়। তাই এর টিকা তৈরি করা যায় না। আবার এইডস রোগের ক্ষেত্রে একজন প্রতিপালকের শরীরের মধ্যেই ভাইরাসটির এমন বেশি হারে অনাক্রম্যতা-এড়ানো পরিব্যক্তি হতে থাকে যে কিছুতেই তাকে সেই শরীরের মধ্যে থেকে কাবু করা বা বের করা যায় না। তাই এইডসের টিকাও হয়নি।
আমরা ভাইরাসের রূপভেদের মধ্যে পরিব্যক্তি বা ভাইরাসের শরীরাংশের অদলবদলের আলোচনা থেকে চলে এলাম প্রতিপালকের শরীরে ভাইরাসের অভিঘাতের অদলবদল-এর আলোচনায়। ভাইরাসের রূপভেদ-এর এই দুটি আলাদা দিক-এ ভাইরাস গবেষণা আলোকপাত করে — প্রথমটিকে বলে জেনোটাইপ, পরেরটিকে বলে ফেনোটাইপ। ফেনোটাইপের মধ্যে পড়বে রূপভেদটি কতটা ছোঁয়াচে (ট্রান্সমিশন), কতটা শক্তিশালী (ভিরুলেন্স), আরটিপিসিআর টেস্ট এড়িয়ে যেতে পারে কি না, প্রতিপালককে কতটা কাবু করে ইত্যাদি। রূপভেদের জেনোটাইপ ল্যাবরেটরিতে জিনোমিক পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষেণের মাধ্যমে অনেকটাই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব। কিন্তু ফেনোটাইপ বলতে গেলে জনস্বাস্থ্য সমীক্ষা এবং তার ওপর দাঁড়িয়ে সংখ্যাতত্ত্বভিত্তিক আন্দাজ-এর বেশি নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
ভাইরাসের এই জাতিগতিতত্ত্ব বা ফাইলোডায়নামিক্স নিয়ে চমৎকার প্রাথমিক আলোচনা পাওয়া যাবে Grenfell et al 2004 এ। ঘোড়ার ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ওপর করা গবেষণা থেকে পাওয়া ফলাফল বিশ্লেষণ করে একজন প্রতিপালকের শরীরের মধ্যে ভাইরাসের জাতিগতিতত্ত্বের একটি কাঠামোও দেওয়া আছে ওই প্রবন্ধে — ক) প্রতিপালকের শরীরে আংশিক অনাক্রম্যতা থাকাকালীন সংক্রমিত হলে শরীরের মধ্যে ভাইরাসটির সবচেয়ে বেশি বিবর্তন হয় এবং তা খুব দ্রুতও হয়। খ) একদম নতুন সংক্রমণে শরীরের মধ্যে যেহেতু ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রথমদিকে কোনো আগাম প্রতিরোধ ব্যবস্থাই থাকে না (কোষের মধ্যেকার সহজাত প্রতিক্রিয়া ছাড়া), তাই তখন প্রতিপালকের শরীরের মধ্যে ভাইরাসের প্রতিলিপি প্রচুর সংখ্যায় হলেও অনাক্রম্যতার চাপ কম থাকায় বিবর্তন কম হয়। যখন অর্জিত অনাক্রম্যতা বাড়তে শুরু করে ততদিনে শরীরে ভাইরাসের সংখ্যা যায় কমে, ফলে তুলনায় অনেক কম বিবর্তন হয় ভাইরাসটির। গ) অপরদিকে, প্রতিপালক ভালোমতো অনাক্রম্যতা অর্জন করে ফেললে তার অর্জিত অনাক্রম্যতা (পরিভাষায় অ্যাডাপটিভ ইমিউনিটি : অ্যান্টিবডি, বি এবং টি স্মৃতি কোষ গঠন) এবং সহজাত (পরিভাষায় ইনেট ইমিউনিটি) প্রতিরোধ ব্যবস্থার কারণে সংক্রমণ খুব কম হয় ও শরীরে ভাইরাসের প্রতিলিপি গঠনও খুব কম হয়; ফলে এক্ষেত্রে প্রতিপালকটির শরীরের মধ্যে ভাইরাসটির বিবর্তন খুব কম হয় এবং যতটুকু হয় তা দেরিতে হয়। অর্থাৎ, প্রতিপালকের আংশিক অনাক্রম্যতা থাকাকালীন সংক্রমণ প্রতিপালকের শরীরের মধ্যে ভাইরাসের বিবর্তনের পক্ষে সবচেয়ে সহায়ক।
(ক্রমশ)