বর্তমান প্যানডেমিক এর অবস্থা আসার আগে থেকেই আমরা জানি যে সারা পৃথিবীর বেশীরভাগ সম্পদ এবং পরিষেবা, মুষ্টিমেয় কিছু সংস্থার আইনী অধিকারে রয়েছে। সম্পদের সুষম বন্টন তো নেইই, উলটে স ম্পদের বন্টনের মধ্যে তফাৎটা বিরাট। আমাদের দেশে এই তফাৎটা তথাকথিত উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আরো অনেক বেশী। সেই মুষ্ঠিমেয় সম্পদশালী সংস্থাগুলোর, সেই বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থাগুলোর, অতিমুনাফার চাহিদা কিন্তু বছরের পর বছর বেড়েই চলেছে। এবং এর ফলে সারা পৃথিবী জুড়ে বারবার তৈরী হয়েছে আর্থিক সংকট।
প্যানডেমিক পরিস্থিতির আগে সারা দুনিয়ার কর্পোরেট সংস্থাগুলোর কার্য্যকলাপ এবং আকাশচুম্বী চাহিদার জন্য, তাদের ওপর নির্ভরশীল সারা দুনিয়ার জনমানুষ আর্থিক সংকটে ভুগছিলই।
এই সব কর্পোরেট সংস্থাদের নিজেদের স্বীকারোক্তি এবং এদের নিয়ে চর্চা যারা করেন, তাদের মতামত অনুযায়ী এই প্যানডেমিক পরিস্থিতি তাদের সামনে এক বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছে, মাঝারি মাপের ব্যবসা, জনমানুষের নিজেদের উদ্যোগের ছোট এবং অতি ছোট ব্যবসা (যেমন পাড়ার দোকান বা রেলের হকার), এদের বাজার দখল করার। এবং একাজ তারা খুব জোরের সঙ্গেই করে চলেছে। ভারত এবং অন্যান্য আরো কিছু দেশে বাজারের একটা বড় অংশ দখল করে ছিল এই মাঝারি, ছোট এবং অতি ছোট ব্যবসাগুলো।
মাঝারি এবং ছোট ব্যবসার যে আঘাত লাগলো, তার থেকেও বড় আঘাত লাগলো শ্রমজীবী মানুষদের। কলখারনার শ্রমিক, কৃষি ক্ষেত্রের শ্রমিক, গ্রাম এবং শহরাঞ্চলের অসংগঠিত শ্রমজীবী মানুষের একটা বিরাট অংশের মানুষ কাজ হারালেন, কাজের অধিকারটুকুও হারালেন, যোগ দিলেন বেকার বাহিনীর দলে। কাজের অধিকার হারিয়ে হাজার কিলোমিটার পথ হেটে নিজের বাড়ি ফেরার চেষ্টা এবং রাস্তায় সরকারী বাহিনীর দ্বারা হয়রানি, আর অপমানের কাহিনী শ্রমজীবী মানুষ মনে রাখবে বহুযুগ। শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বেকারত্ব যত বাড়ে, তাদের মাইনে নিয়ে দরাদরি করার ক্ষমতাও তত কমে, এ তো আমাদের অভিজ্ঞতা।
এই প্যানডেমিক পরিস্থিতিতে শ্রমজীবী মানুষ নতুন করে যে সম্পদ হারালেন, তাতো নষ্ট হলো না, সেগুলো লাভ করলো সম্পদশালী মানুষেরা, বড় বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলো। তার মানে সম্পদ বন্টনের মধ্যের তফাৎটা, অসাম্যটা আরো বাড়লো।
এই যে এতো কিছু হোলো তা হোলো লকডাউন করে দিয়ে, শ্রমজীবী মানুষের ওপর "কোভিড বিধি" চাপিয়ে দিয়ে। বৃটিশ আমলের মহামারী আইন আর ২০০৫ সালের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এ্যক্ট এর অজুহাতে।
কোভিড বিধি চাপিয়ে দিয়ে জন মানুষকে শুধু আটকে রাখা হোলো তাই নয়। নানা রকম কালা কানুন পাশ করিয়ে নেওয়া হোলো সংসদে আর বিধানসভাগুলোতে। যেমন তিনটি কৃষি বিল, যেমন বিদ্যুৎ বিল, যেমন শ্রম কোড। আবার কিছু বিষয় সংসদ বা বিধানসভাগুলো কে এড়িয়েই করে নেওয়া হচ্ছে। যেমন নয়া শিক্ষা নীতি, সংসদ বা বিধানসভাগুলো তে আলোচনা না করেই কার্যকর করে ফেলা হচ্ছে। শিক্ষাকে বেসরকারী হাতে তুলে দেওয়া, শিক্ষার গৈরিকিকরন, জনমানুষের শিক্ষার অধিকার সংকোচন - এই নয়া শিক্ষা নীতির মূল কথা। সংসদ আর বিধানসভাগুলোতে আলোচনা না করেই প্রায় দুবছর ধরে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এ্যক্ট চালু রয়েছে। সম্পূর্ণ বেআইনী ভাবে।
কৃষি ক্ষেত্র কে বড় কর্পোরেট সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া, শ্রমজীবীদের সামান্য অধিকার টুকুও কেড়ে নেওয়া, জনগনের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া - এ যেন এক হীরক রাজার দেশ।
সরকারের কানে মানুষের কথা পৌছনোর পদ্ধতি এমনিতেই খুব কম। আর এই কোভিড পরিস্থিতিতে সংসদ এবং বিধানসভাগুলোকে ঠুটোঁ করে রেখে দেওয়ার ফলে সেই সামান্য সুযোগটুকুও হারিয়ে গেছে। এই অবস্থা কি ১৯৭৫ সালের এমার্জেন্সির থেকে কিছু কম?
মানুষের কথা সরকারের কানে পৌছনোর উপায় তাহলে আন্দোলন। কিন্তু কোভিড বিধির অজুহাতে সেই আন্দোলন আটকানোর প্রানপন চেষ্টা করে গেছে আমাদের দেশের ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন প্রাদেশিক সরকার। এন আর সি বিরোধী আন্দোলন কে আটকাতে পেরেছে। শাহিন বাগ অবস্থান কে উঠিয়ে দিতে পেরেছে। পার্ক সার্কাস অবস্থান কে উঠিয়ে দিতে পেরেছে। জন মানুষ সেই সময় প্যানডেমিক এর প্রচারের ধাক্কায় একটু ধন্দে পড়ে গিয়েছিল। পারেনি কৃষক আন্দোলন কে আটকাতে। সেক্ষেত্রে মানুষ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। বহু ক্ষতি সত্ত্বেও অনমনীয় জেদ নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন।
একদিকে জনমানুষের সামান্য অধিকার, সামান্য সম্পদকে বড় বড় কর্পোরেট সংস্থা হাতিয়ে নিচ্ছে, আর অন্য দিকে সরকার সেই কাজে তার দোসর হচ্ছে, জনগনের আন্দোলন কে আটকে রেখে দিচ্ছে, তার স্বাধীন রোজগারের উপায় বন্ধ করে দিচ্ছে। তাকে বাধ্য করছে বেকারত্বে। কোভিড ভ্যাক্সিন, যেটা বহু ভাবে বিপজ্জনক হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেটা বাধ্যতামূলক নয় বলেও তাকে শর্ত করছে, রোজগারের অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য। এটা ফ্যাসীবাদ ছাড়া আর কি? সারা বিশ্বেই এই ধারা চলছে, সারা বিশ্বেই মানুষ এর বিরুদ্ধে পথে নামছেন। কোথাও কোথাও সংঘর্ষে পর্য্যন্ত চলে যাচ্ছেন।
কিন্তু এই ফ্যাসীবাদী অবস্থা, এই কোভিড পরিস্থিতি, শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে জারি করা যায় নি। কোভিড নিয়ে আতংকের নির্মান করতে হয়েছে। কোভিড যে কর্পোরেট সাম্রাজ্যের কাছে এক সুযোগ এনে দিয়েছে তাই শুধু নয়। কোভিড পরিস্থিতিকে তৈরী করা হয়েছে এই ফ্যাসীবাদী অবস্থা তৈরী করার জন্য। সারা দুনিয়া জুড়ে এই আতংকের নির্মান করা হয়েছে, কিছু অপবিজ্ঞান এর আমদানী করে। একটা ভুয়ো পরীক্ষা পদ্ধতি কে (আর টি পি সি আর) কাজে লাগিয়ে, মানুষের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক নতুন, অবৈজ্ঞানিক, অযৌক্তিক, নিদান এর মাধ্যমে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরীক্ষিত সত্যগুলোকে প্রচারের মাধ্যমে পালটে দিয়ে। কাজে লাগানো হয়েছে আন্তর্জাতিক গনমাধ্যম গুলোকে। সাথী করা হয়েছে কর্পোরেট ডাক্তারদের।
গন মননে আতংকের নির্মান করে, আর প্রশাসনিক আদেশ বলে করা হচ্ছে লকডাউন, বাধ্য করা হচ্ছে কোভিড ভ্যাক্সিন নিতে। এ ভ্যাক্সিন অন্য যেকোনো সাধারণ ভ্যাক্সিন এর মতো নয়। এ ভ্যাক্সিন অপরীক্ষিত, জিনগত পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে এ ভ্যাক্সিন, এ ভ্যাক্সিন নানা ধরনের অন্যান্য রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এ ভ্যাক্সিন এর দ্বারা আপনার গতিবিধি নজরে রাখার চেষ্টা হচ্ছে, এমন অভিযোগও আছে, এবং এমন অভিযোগের বাস্তব ভিত্তিও আছে।
বিগত এক দশকের ছোট বড় নানা ঘটনা, বিশেষত জ্ঞানবিজ্ঞানের জগতের এবং সাংস্কৃতিক জগতের কিছু ইতিহাস বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায় যে এই প্যানডেমিক এক পরিকল্পিত ঘটনা। অনেক বছর ধরে, অনেক পরিকল্পনা করে ধীরে ধীরে জাল গুটিয়ে এনে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। ফ্যাসীবাদী বিশ্ব ব্যাবস্থা কায়েম করার জন্য। ফ্যাসীবাদ কায়েম করার জন্য চিকিৎসাবিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে, আতংকের নির্মান করা হয়েছে।
তাই আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে জনস্বাস্থ্য কে হাতিয়ার করে ফ্যাসীবাদী আক্রমণ নেমে এসেছে আমাদের জীবনে, সেই জনস্বাস্থ্যকেই হাতিয়ার করে, সেই হাতিয়ার গন আন্দোলনের হাতে তুলে দিতে হবে, বিশ্ব ফ্যাসীবাদের আক্রমণ কে রুখে দেওয়ার জন্য।
সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা তৈরী করেছিলাম আমাদের গ্রুপ, Global Rational Alliance for Public Health (GRAPH)। এই গ্রুপের মাধ্যমে আমরা প্রচার এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলাম আমাদের।
কিন্তু পরিস্থিতি দাবী করছে এক সঙ্গঠন। দাবী করছে যে এই সঙ্কটকালে জন মানুষের পাশে দাঁড়ানো সব সংগঠন এবং ব্যক্তি মানুষ এক হয়ে একে অপরকে সাহায্য করুন। জন মানুষকে আন্দোলন মুখী করে তোলার কাজে সবাই সবার সহযোগী হোন।
আর তাই আমরা উদ্যোগ নিয়েছি এক যৌথতা গড়ে তোলার। এক এ্যলায়েন্স গড়ে তোলার। যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির বিশেষ জ্ঞান আন্দোলনের সহায়ক হয়ে উঠতে পারে, আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ব্যক্তির, সার সংকলন করার কাজে লাগতে পারে, এক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা অন্য আন্দোলনের পাথেয় হতে পারে, এবং আন্দোলন গুলো একে অন্যকে সাংগঠনিক সাহায্যও দিতে পারে।
এই উদ্যোগ এক সঙ্গঠনের আকার নেবে এক সম্মেলন এর মধ্যে দিয়ে, আগামী ২০শে ফেব্রুয়ারী।
এই সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে আমরা তৈরী করবো
১। গ্রাফ এর কর্মসূচী এবং কর্মপদ্ধতি।
২। গ্রাফ এর গঠনতন্ত্র।
৩। গ্রাফ এর ন্যূনতম সাধারণ ধারনা বিষয়ক আরো কিছু দলিল।
প্রস্তাবিত কর্মসূচী, কর্মপদ্ধতি, গঠনতন্ত্র, ও দলিল গুলো আমরা এখানে প্রকাশ করলাম যাতে সকলের মতামত GRAPH-এর সম্মেলন প্রক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করতে পারে। মতামত পাঠাতে পারেন, এই ইমেইল ঠিকানাটি spambots থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। এটি দেখতে হলে আপনার জাভা স্ক্রিপ্ট সক্রিয় থাকতে হবে।এ।