(মূল লেখাটি, azadi.live এ ১ জুলাই, ২০২১ প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটির মূল লিংক ‘এইখানে’। এই দীর্ঘ প্রবন্ধটিকে পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করে প্রকাশ করা হচ্ছে – সম্পাদক, গ্রাফ)
(দুই ডোজ কোভিড টিকা নেওয়ার পরেও যে-কোভিড সংক্রমণ হয়ে থাকে তাকে ‘টিকাভাঙা সংক্রমণ’ বলা হয় – সম্পাদক, গ্রাফ)
(এক)
এখন করোনার যে সমস্ত টিকা সারা বিশ্ব জুড়ে চলছে, সেগুলি সবই প্রায় দুটি ডোজ-এর, যাদের মধ্যের ব্যবধান মাস খানেকের মতো। এই টিকা তৈরি হতে চার পাঁচ বছর লাগার কথা, কিন্তু এক বছরের মধ্যে টিকাগুলি তৈরি করে ফেলা হয়েছে, যা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায় বলে ধন্য ধন্য হয়েছে। নিন্দুকেরা অবশ্য বলেছে, এগুলি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে এখনও এবং এই টিকা ব্যবহারে বিপদ হতে পারে। সে সমস্ত বিপদের সম্ভবনা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে সারা পৃথিবীর রাষ্ট্রীয় এবং অতিরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি এই আধাখ্যাঁচড়া টিকাগুলিকে জরুরি প্রয়োগের ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছে। গত বছরের শেষের দিক থেকেই টিকা দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। ইজরায়েল এবং ব্রিটেন এই কাজে সবচেয়ে এগিয়ে, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রও পিছিয়ে নেই।
এসবের মধ্যেই মাস তিনেক আগে থেকে একটি কথা ঘন ঘন উচ্চারিত হতে শুরু করেছে — টিকাভাঙা সংক্রমণ বা ভ্যাক্সিন ব্রেকথ্রু ইনফেকশন। দুটি ডোজ নেবার দু-সপ্তাহ পর থেকে যদি গ্রহীতার সংক্রমণ হয় তাকে বলে, টিকাভাঙা সংক্রমণ। সংজ্ঞা এটা, কিন্তু টিকাভাঙা সংক্রমণের যে কায়দা, তাতে টিকা নেবার পরে সংক্রমিত হলে সেটাকেই টিকাভাঙা সংক্রমণ বলা যেতে পারে। আমরা প্রথম ডোজ নেবার পর সংক্রমণ হলে সেটাকে আংশিক টিকাভাঙা সংক্রমণ এবং দ্বিতীয় ডোজ নেবার পর সংক্রমণ হলে সেটাকে টিকাভাঙা সংক্রমণ বলব।
যাই হোক, টিকা নেওয়া সত্ত্বেও অনেকেই সংক্রমিত হচ্ছে। প্রথমে বলা হচ্ছিল, টিকার কার্যকারিতা শুরু হবে দ্বিতীয় ডোজ নেবার দু-সপ্তাহ পর থেকে। ফলে তার আগে টিকাগ্রহীতা সংক্রমিত হলে তাকে টিকার ব্যর্থতা বা টিকাভাঙা সংক্রমণ বলা যাবে না। দেখা গেল, না, টিকাভাঙা সংক্রমণ বাস্তব। তখন প্রতিষ্ঠানগুলির তরফে বেশ কয়েকটি অজুহাত দেওয়া হল। যেমন, ১) টিকাগুলির পরীক্ষাগার-কার্যকারিতা (এফিকেসি) এবং বাস্তব-কার্যকারিতা (এফিসিয়েন্সি/ ইফেকটিভনেস) — দুটিই একশ’ শতাংশ নয়, তার কম। ফলে টিকাভাঙা সংক্রমণ হতেই পারে। টিকা যে একশ’ শতাংশ কার্যকরী হবে, এটা প্রত্যাশার বাহুল্য, ইউটোপিয়া। ২) টিকাগুলি ভাইরাসের আদি রূপটির বিরুদ্ধে কার্যকর কি না, তারই পরীক্ষা হয়েছে শুধু। কিন্তু এখন এই আরএনএ ভাইরাসটি বদলাচ্ছে এবং তার নতুনতর রূপভেদ তৈরি করছে। ৩) টিকাগুলি সংক্রমণ কমাবে এবং সংক্রমিত হলেও অসুস্থতা এবং মৃত্যুর সম্ভবনা কমাবে। ৪) টিকাগুলি সামগ্রিকভাবে সংক্রমণে লাগাম টেনে অতিমারিকে সংক্ষেপিত করবে; এবং সংক্রমণে লাগাম দেওয়া হলে তার মাধ্যমে বেশি ছোঁয়াচে ও বেশি শক্তিশালী রূপভেদ তৈরি আটকাবে । ৫) টিকা থেকে পাওয়া প্রত্যক্ষ অনাক্রম্যতা বা অ্যান্টিবডি প্রতিরোধ ভাঙলেও টিকা থেকে পাওয়া অপ্রত্যক্ষ অনাক্রম্যতা (স্মৃতি কোষ জনিত) রক্ষাকবচের কাজ করবে।
বলাই বাহুল্য, এগুলি সবই মূলতঃ অনুমান ভিত্তিক এবং কিছু প্রাথমিক প্রমাণ ভিত্তিক। যেমন, টিকাগুলি সংক্রমণ কমাবে এবং সংক্রমিত হলেও অসুস্থতা ও মৃত্যুর সম্ভবনা কমাবে — এগুলি যে জনস্বাস্থ্য সমীক্ষা ভিত্তিক গবেষণার ওপর দাঁড়িয়ে বলা হল — তা অনেকটাই টিকাগুলির তাড়াহুড়োতে করা তৃতীয় দফার মহড়া-র মতো। কতদিন পর্যন্ত এই ‘কমাবে’, তা উহ্য রইল, কারণ বেশিরভাগ জনস্বাস্থ্য সমীক্ষাই করা হল দ্বিতীয় টিকা নেবার পর খুব বেশি হলে একমাস পর্যন্ত সময়সীমা পর্যবেক্ষণ করে। বেশিরভাগ গবেষণাই প্রচুর অনুমানের আশ্রয় নিল। যেমন, টিকা নেবার পর সংক্রমিত হচ্ছে কি না তা সক্রিয়ভাবে ফলো-আপ করা হল না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তুলনা টানার জন্য যারা টিকা নেয়নি তাদের সঙ্গে কোনো সমবৈশিষ্ট্যের বা ‘কোহর্ট’ পর্যবেক্ষণ হল না ইত্যাদি। এই সরলরৈখিক সম্পর্ক ধরে নেওয়া হল — ছোঁয়াচে ও শক্তিশালী রূপভেদ তৈরি হবে কেবলমাত্র সংক্রমণ চলতে থাকলে; ফলে প্রাথমিকভাবে সংক্রমণ কমানোই লক্ষ্য — তা হলেই রূপভেদ তৈরি আটকাবে। আর পাবলিককে বলা হল, টিকা নিলে সংক্রমণের সম্ভবনা কমবে, সংক্রমিত হলেও গুরুতর অসুস্থ হবার সম্ভবনা বা মৃত্যুর সম্ভবনা কমবে। ফলে মিডিয়ার মাধ্যমে, জনপরিসরে টিকা এল নিজেকে বা নিজেদের বাঁচানোর একটা উপায় হিসেবে, ব্যক্তিগত করোনা-প্রতিষেধক হিসেবে। মানুষ এই ব্যক্তিগত করোনা-প্রতিষেধক হিসেবে প্রচুর হোমিওপ্যাথি বা আয়ুর্বেদিক বড়ি খাচ্ছিল, ভিটামিন বা মিনারেল ট্যাবলেট খাচ্ছিল। টিকা এল সেরকমই একটা কিন্তু অনেক বেশি কার্যকরী একটা ইঞ্জেকশন হিসেবে। কে না জানে, ওষুধে-এ কাজ না দিলে ইঞ্জেকশন নিতে হয়!
(ক্রমশ)