২৪ ও ২৫ মার্চের মধ্যরাত থেকে চারঘণ্টার নোটিশে লকডাউন করা হল, তখন বলা হল-(১) বাস, ট্রাম,ট্রেন, বিমান, জাহাজে করে বা এমনকি পায়ে হেঁটে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া বন্ধ, (২) বাড়ির বাইরে বেরনো চলবে না, (৩) অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ, দোকান-বাজার, নাটক-সিনেমাহল,কারখানা সব বন্ধ। এমনকি খুব জরুরী প্রয়োজন ছাড়া হাসপাতালে না যাওয়ার কথাও বলা হল। সভা-সমিতি, মিছিল-জমায়েত বন্ধ। ভারতবর্ষের সংবিধান দ্বারা প্রাপ্ত অধিকারগুলো খর্ব হলো
আমরা একটা নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে চলেছি। এর ফলে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, এক নতুনতর ব্যবস্থার উদ্ভব হচ্ছে, যেখানে নামে-বেনামে বহুজাতিক শিল্পনিগমগুলি কার্যত রাষ্ট্রকে পরিচালনা করছে। এই ব্যবস্থা সম্পদ এবং ক্ষমতা মুষ্ঠিমেয় কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত হওয়ার যুগপৎ কারণ এবং ফলাফল। বিগত দুই বছর ধরে বিভিন্ন ঘটনাক্রমে এটি প্রকটভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। এটাও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে যে, আমাদের এমন এক নতুন-পৃথিবীর-কানুনে থাকতে হবে, যেখানে অধিকাংশ মানুষ তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্বাধীনতা ও মর্যাদাসম্পন্ন জীবনধারণের মৌলিক অধিকার থেকে আরও বঞ্চিত হবে।
কোভিড পরিস্থিতি এবং তার সঙ্গে সঙ্গে লকডাউন থেকে শুরু করে এক সার্বিক অচলাবস্থা এল এমন একটা সময় যখন ২০০৮-০৯ সালের গ্রেট ডিপ্রেসনের থেকেও খারাপ অবস্থায় চলে গিয়েছিল অর্থনীতি। অর্থনৈতিক সংকোচন ছিল মাত্রাছাড়া। আসলে ২০০৮ সালের মহামন্দার পর থেকেই বিশ্ব অর্থনীতি একটা ভয়ঙ্কর স্থবিরতার মধ্যে চলে গিয়েছিল। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে এই সঙ্কট ঘুরে ঘুরে আসে আর তখন কোরামিন দিতে শোষণের নতুন নতুন পন্থা বার করে তারা। কোভিড পূর্ববর্তী সময় থেকে মুনাফার এই সঙ্কট থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে কোভিড ন্যারেটিভও একটি মরিয়া প্রচেটা
রাষ্ট্র কোভিড ন্যারেটিভ গিলিয়ে দিয়ে যে আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি করতে পেরেছে এবং লকডাউন চাপিয়ে দিয়েছে বিষয়টা শুধু এমনই নয়, জনগণের একাংশের সম্মতিও আদায় করে নিয়েছে এক্ষেত্রে। জনস্বাস্থ্যের দোহাই দিয়ে যে কোনও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ এবং আন্দোলনকে দমন করতে ব্যবহার করেছে বিপর্যয় মোকাবিলা আইন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতির তোয়াক্কা না করে কৃষি বিল, শ্রম কোড সহ একের পর এক কর্পোরেট স্বার্থ চরিতার্থকারী আইন পাশ করে নিয়েছে ঘুরপথে, এমনকি সংসদকেও এড়িয়ে। জনগণের মধ্যে আলোচনা তো দূরস্থান। এসব খুব সহজেই সম্ভব হয়েছে জনস্বাস্থ্যের অজুহাত দেখিয়ে। মাস্ক, বাধ্যতামূলক ভ্যাকসিন, সামাজিক দূরত্ব, লকডাউন সহ একের পর এক বিধি চাপিয়ে গেছে সাধারণ মানুষের ওপর, যা একদিকে কেড়ে নিয়েছে মানুষের জীবিকা, স্বাধীনতা এবং ন্যূনতম মৌলিক অধিকার। বহু মানুষ খেয়ে পরে টিকে থাকার আর্থিক সংস্থানটুকুও হারিয়েছেন এই লকডাউনে।
কোভিড পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ যে ছবি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন, সেটা যদি তাঁরা নিজেরাও বিশ্বাস করতেন, তাহলে এই বিষয়টার প্রতি আরও অধিক যত্ন নিতেন, নেওয়া উচিৎ ছিল। বিশ্ব, দেশ, রাজ্য জুড়ে যে দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হলো, তার ফলে মানুষের জীবনে যে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে তার সম্পর্কে শুরুতে কোন প্রস্তুতি না থাকতে পারে, কিন্তু বিপর্যয়ের মধ্যে বেশ কিছুটা সময় চলে যাওয়ার পরে প্রস্তুত হওয়ার চেষ্টাটাও যখন চোখে পড়ে না, তখন হয় ভয়াবহতার ওই চিত্রটা শুধুই ভয় দেখানোর জন্য কিনা, এ প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
যে কোন সংকট পরিস্থিতিকে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিও চেষ্টা করে, জনগণের সংকটমুক্তির লড়াইয়ে সামিল হয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি যেহেতু এই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করছে, তাদের আন্দোলনের বিরোধিতা করাটাই বামপন্থার পরকাষ্ঠা - এভাবে দেখার মধ্যে একটা যান্ত্রিকতা আছে। বরং বামপন্থী রাজনীতির কাজ হওয়া দরকার ছিল, দক্ষিণপন্থী রাজনীতির স্বার্থকে উন্মোচন করতে জনগণের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া। রাষ্ট্রের তৈরি কোভিড বয়ান-কে মান্যতা দিয়ে বামপন্থী রাজনীতির যে অংশ বিজ্ঞানের দাবি করছেন, তাঁরা আসলে, দক্ষিণপন্থী রাজনীতির স্বার্থকেই পুষ্ট করছেন।
দীর্ঘকালীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মানুষের অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকারকে ধরে রাখার, কার্যকরী করার এবং যেকোন গণতন্ত্রবিরোধী প্রয়াসের থেকে রক্ষা করার যে ন্যূনতম এবং সীমিত কাঠামো সেগুলোকে বাতিল করার চেষ্টায় কোভিড ন্যারেটিভকে ব্যবহার করা হয়েছে । রাষ্ট্রের এই অগণতান্ত্রিক অবস্থানের বিরোধিতা করছে গ্রাফ।
খাদ্য-স্বাস্থ্য-শিক্ষা-বস্ত্র-বাসস্থান – জনগণের সংগ্রামের এই অর্জিত অধিকারগুলোকে নাকচ করতে কোভিড ন্যারেটিভকে ব্যবহার করা হচ্ছে । এই সমস্ত বিষয়গুলোকে একচেটিয়া পুঁজির মুনাফার মৃগয়াক্ষেত্র করে তোলা হল সামগ্রিক বেসরকারিকরণের উদ্যোগ। গ্রাফ এই সার্বিক বেসরকারিকরণের তীব্র বিরোধী ।
গত দুবছর ধরে কোভিড বিধির নামে যে সামাজিক বিধিনিষেধ গুলো রাষ্ট্র আমাদের জনজীবনে চাপিয়ে দিচ্ছে এবং রাখছে, যেমন বাধত্যতামূলক মাস্ক পরা, লকডাউন এবং জায়গায় জায়গায় আংশিক লকডাউন, জীবন জীবিকার জায়গা থেকে মানুষকে উৎখাত করা,ভ্যাকসিন এর বাধ্যবাধকতা, ইত্যাদি তা সবই হচ্ছে জনস্বাস্থ্য কে সামনে রেখে, বলা ভালো জনস্বাস্থ্য কে অজুহাত করে। তাই এই সামগ্রিক অবস্থার মোকাবিলায় আমাদের প্রয়োজন জনস্বাস্থ্যর গড়ে ওঠার ধারণা, জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া আর একবার একটু ঝালিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজন, এর বিরুদ্ধে জন আন্দোলনে জনস্বাস্থ্যকেই হাতিয়ার করে তোলা।