বন্ধুরা,
বেশ কয়েক মাসের লাগাতার চেষ্টায় আমরা চিকিৎসক, আইনজীবী, বিজ্ঞানী, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, লেখক, সমাজকর্মী ও অধিকাররক্ষার কর্মীরা মিলে একটি নাগরিক সংগঠনগড়ে তুলেছি। এর নাম, GLOBAL RATIONAL ALLIANCE FOR PUBLIC HEALTH (GRAPH)। এই সংগঠন কোভিড-১৯-এর প্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করেসামাজিক, অর্থনৈতিক, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মানবিধাকার বিষয়ে যে-পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে এবং ক্রমাগত ঘটে যাচ্ছে তার প্রতি নজর রেখে চলেছে। আমরা জনস্বাস্থ্য নিয়েএকটি যুক্তিপূর্ণ ও মানবিক অবস্থানের পক্ষে। আমরা লক্ষ করছি যে, একটি নির্দিষ্ট রোগের জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত পদক্ষেপ নিতে গিয়ে সমগ্র স্বাস্থ্য পরিষেবাই এখন বিপর্যয়ের মুখে। আমরা এই একপেশে ও বিপজ্জনক দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করি। শরীরের ওপর নিজেদের অধিকার সমেত যেসব মৌলিক অধিকার বর্তমান সংবিধান আমাদের দিয়েছে আমরা তাতুলে ধরতে চাই। তাই আমরা যে কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবিধি প্রবর্তনের বিরোধিতা করি। আমরা এও বিশ্বাস করি যে, মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন আমাদের অধিকার এবং তাকে কোনো বাধ্যতামূলক আইনী ফতোয়া দিয়ে হরণ করা যায় না।
আমরা লকডাউন ব্যবস্থাটাকে নানা নামে ও নানা মাত্রায় প্রত্যক্ষ করে চলেছি। এই ভয়ংকর ব্যবস্থাটিকে বিশ্বের বহু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ "ধনীদের বিলাসিতা" বলে অভিহিত করেবলেছেন, এই ব্যবস্থা অমানবিক ও ধবংসাত্মক! এটা সমাজের দরিদ্রতম শ্রেণীকে ভীষণভাবে আঘাত করেছে। ডিজিটাল বাণিজ্যব্যবস্থার প্রতি অন্যায় পক্ষপাতের ফলে স্থানীয়, ছোটবা মাঝারি ব্যবসাগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। যেভাবে গণ পরিবহণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে তাতে শুধু স্থানীয় সরবরাহ-শৃংখলই নষ্ট হয়নি, আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনও ক্রমশ এমনভাবে তছনছ হয়ে যাচ্ছে যা অপূরণীয়। শিশুদের এক অনিশ্চিত ও অন্ধকারময় ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আমরা সবধরনের দমনমূলক ব্যবস্থা ও লকডাউন সম্পূর্ণভাবে উঠিয়ে নেওয়ার দাবি করছি।
আমরা এও দাবি জানাচ্ছি, ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষকে যে বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে, তা পূরণে যথাযথ, বিকল্প নীতি গ্রহণ করতে হবে।
কোভিড প্রতিষেধক বা টিকা যে স্বেচ্ছাধীন বা ঐচ্ছিক তা একাধিক "RTI" থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে। তা সত্ত্বেও অনেক স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারী সংস্থা এই প্রতিষেধকনিতে কর্মীদের বাধ্য করছে। আমরা একথা জেনে মর্মাহত যে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রেস বিবৃতি মারফৎ লকডাউন বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেছে, এবং কেবল প্রতিষেধক-প্রাপ্ত ব্যক্তিরাই কর্মক্ষেত্রে ও সরকারী পার্কে প্রবেশাধিকার পাবেন বলে জানিয়েছে। এটা শুধু আমাদের স্বাধীন চলাচলের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনই নয়, এটা একই সঙ্গে এক দমনমূলকপদক্ষেপ, যা চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক বৈষম্যরাজের সূচনা করবে! বস্তুত রাজ্য সরকার নির্মাণকর্মীদের বাধ্যতামূলক প্রতিষেধক গ্রহণের পক্ষে সওয়াল করেছে। আমাদের উদ্বেগ, অসংগঠিত ক্ষেত্রের মানুষরাই এই বাধ্যতামূলক প্রতিষেধক অভিযানের জন্য সমাজের সবচেয়ে বিপন্ন অংশ হতে চলেছেন।
সাম্প্রতিকতম সরকারী প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সমস্ত উৎপাদন সংস্থা, শিল্প সংস্থা (তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি সহায়ক সংস্থাসহ) পঞ্চাশ শতাংশ কর্মী নিয়ে কাজ শুরুকরতে পারবে, যদি তাদের প্রতিষেধক নেওয়া থাকে। এটা ভারত সরকারের অবস্থানের ( যা RTI মারফৎ জানা গেছে ) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একটি এমন RTI বলছে, - "কোভিড-১৯ এর প্রতিষেধক গ্রহণ স্বেচ্ছাধীন। এই প্রতিষেধক না নেওয়ার জন্য কাউকে সরকারী চাকরী/সুবিধা/ প্রকল্প থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।"
এমতাবস্থায়, আমরা আপনার কাছে/আপনার সংগঠনের কাছে আবেদন জানাই, একটি সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচী (common minimum agenda ) গ্রহণের বিষয়ে ঐক্যবদ্ধহোন এবং এই অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক, এবং অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্বর তুলে ধরুন। এ জন্য প্রয়োজনীয় গণ সচেতনতা প্রচারে অংশগ্রহণ করুন। যতক্ষণ নাপর্যন্ত লকডাউন সম্পূর্ণ উঠে যাচ্ছে, ততদিন আমরা ডিজিটাল মাধ্যমে, ওয়েবিনার ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে আমাদের প্রচার চালাতে পারি।
তারিখ: ১৭ জুন, ২০২১
অভিনন্দন সহ -
ডাঃ ভাস্কর চক্রবর্তী
আহবায়ক, GRAPH।