বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২০ সালের প্রথম মাসেই অতিমারী ঘোষণা করে জানিয়েছিল, অকস্মাৎ সারা বিশ্বের জনস্বাস্থ্য এক তীব্র সংকটের মুখে পড়েছে। নিজেদের এবং প্রিয়জনের স্বাস্থ্যের সমূহ বিপদের কথা ভেবে আপামর জনমানুষ সন্ত্রস্ত হয়েছিলেন। এর পর থেকে সন্ত্রাস ক্রমশ বেড়েছে, কেননা বিভিন্ন দেশের সরকার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিপদ থেকে উত্তরণের যে-দিশা দেখিয়েছে তাতে আমাদের জীবনের যাপনভূমি প্রায় বন্ধ্যা হয়ে গেছে। তাই সন্ত্রাসের সঙ্গে জুড়েছে অপার বিস্ময়। আমরা ভাবতে বাধ্য হয়েছি, মারক কি তাহলে একটি “নতুন” ভাইরাস, নাকি তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা নীতি আর পদ্ধতিগুলিই। ক্রমশ একথা স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, “ভাইরাস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ” যেন চলমান অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি এবং সর্বোপরি জনজীবনের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ। এও স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, ভাইরাস এই যুদ্ধের নীতি আর পদ্ধতিগুলির কোনওটিকেই রেয়াৎ করেনি, সে চলেছে তার নিজের নিয়মে, নিজের খেয়ালে। অথচ তার দিকে আঙুল তুলে জনমানুষকে জড়বৎ, পুতুলে পরিণত করে দেওয়া হচ্ছে।

এই উপলব্ধি আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করল। কারণ, মানুষ যুক্তির স্রষ্টা এবং যুক্তিরই দাস। সেই যুক্তির কষ্টিপাথর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মানুষকে নির্বোধ, অবিবেচক পশুতে পরিণত করা সরকারের কাজ না; তার কাজ, চিন্তায় শান দেওয়া, মানুষকে মুক্তি আর স্বাধীনতার স্বাদ দেওয়া, সহযোগিতার পথ দেখানো। অথচ সরকার উলটো পথে হাঁটল। শুধু তাই না, আমরা দেখলাম, আমাদের বুদ্ধিজীবীদের বৃহৎ অংশই অপ্রমাণিত, অযৌক্তিক আতংকে কুঁকড়ে থেকে, নিজেদের চিন্তাশক্তি জলাঞ্জলি দিয়ে সেই উলটো পথের পথিক হয়ে গেলেন। এমনকী, অনেকে সেই পথের খননকর্মে দিনাতিপাত করে চললেন। আমরা ভাবতে বাধ্য হলাম, তাহলে কি মানব সভ্যতার রথ আবার সেই অন্ধকার যুগের দিকেই চলতে থাকবে? এই কি নিয়তি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে-জনস্বাস্থ্যের সংকটের কথা বলেছিল, তা ঠিক; কিন্তু জনমানুষের অন্তরের ভাবনা, তার বিবেচনা আর সম্মতি ছাড়া জনস্বাস্থ্য কি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? জনস্বাস্থ্যের নীতি আর পদ্ধতি কি তাঁদের হয়ে কতিপয় বুদ্ধিজীবী রচনা করে দিতে পারেন?

এই ভাবনা থেকে আমরা জনমানুষের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করলাম। আমরা বুঝলাম, জনস্বাস্থ্য নিয়ে পুরনো ধারণাগুলো ত্যাগ করতে হবে। এটি শুধু ডাক্তারি বিজ্ঞানের ব্যাকরণগত সমস্যা না, জনস্বাস্থ্য আসলে সমাজবিজ্ঞানেরই সমস্যা। ধরিত্রীর বুকে অণুজীব, পরজীব আর অগণিত উদ্ভিদসমাজের তুলনায় মনুষ্যসমাজ নেহাতই অর্বাচীন; আমরাই তাদের জমিতে উপনিবেশ গড়েছি। তাই তাদের প্রতি শুধু বৈরিতার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমরা নিরাপদ থাকতে পারব না। বৈরিতার ধারণা সমাজেও বৈরিতার জন্ম দেয়। বরং নতুন, উন্নত, মসৃণ পথের কথা ভাবতে গেলে, জনসমাজের বিচিত্র উপাদানগুলিকে সঙ্ঘবদ্ধ করতে হবে। আমরা এও বুঝলাম যে, আজকের উদ্ভট ও ভয়ংকর পরিস্থিতি আসলে একটি বিশ্বসংকট। এই সংকটের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বিশ্ব রাজনীতি আর বৈশ্বিক অর্থনীতির হালচাল। অতিমারীকে কেন্দ্র করে, স্বাস্থ্যের অজুহাত দেখিয়ে সারা বিশ্বে স্বৈরতন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে, “নতুন” দুনিয়ার “নতুন” কানুন লাগু করার পরিত্রাহী চেষ্টা চলছে। “নতুন”-এর প্রতি আমরা নিরাসক্ত নই, কিন্তু সেই দুনিয়ায় বশ্যতার লাগাম পরতে আমরা অরাজি।

বরং আমরাও দুনিয়াটিকে নতুনভাবে গড়ে নিতে চাই; কিন্তু সেই নির্দেশ আসবে জনমানুষের সম্মিলিত মঞ্চ থেকে, কিছু পণ্ডিতের ঊর্বর কল্পনা থেকে না। আমরা নিশ্চিত যে, আমাদের এই উপলব্ধি মোটেই অনন্য, অনুপম না; বিশ্বের সর্বত্রই এই ধারণাগুলি ক্রমশ জারিত হচ্ছে। তাই আমরা জনস্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করে একটি নতুন সংস্থা তৈরির কাজে হাত দিয়েছি।

আমাদের সংস্থার নাম, “গ্লোবাল র‍্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর পাবলিক হেলথ” বা সংক্ষেপে, “গ্রাফ”। বিশ্বপুঁজির মতিগতি এবং জনস্বাস্থ্যের বিজ্ঞান নিয়ে এই সংস্থার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে; কিন্তু একইসঙ্গে নানাবিধ সংগঠনের মধ্যে এই সংস্থা একটি মৈত্রীবন্ধনের কাজ করবে। বিজ্ঞান মঞ্চ, অধিকার মঞ্চ, চিকিৎসকদের সংগঠন, কর্মচারী ও মজুরদের সংগঠন, অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক কর্মী, ইতিহাসবিদ ইত্যাদি সকলের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করতে চাই। অন্যান্য সংগঠন বা এমনকী, ব্যক্তিবিশেষ সর্ববিষয়ে সর্বক্ষণ আমাদের সঙ্গে সহমত হবেন, এমন দাবি আমরা করি না। কিন্তু এক-একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে, এক-একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে সকলে সহমত হতে পারবেন, এমন আশা করি।

যেমন, আজকের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আমাদের মাত্র তিনটি দাবি বা বলা যায়, লক্ষ্য। আমাদের আবেদন, এক, “লকডাউন” নামে ভয়ংকর, বর্বর, অমানবিক এবং অবৈজ্ঞানিক প্রথাটিকে সম্পূর্ণভাবে রদ করা হোক। তার বদলে জনজীবনের যাবতীয় উপাদানগুলিকে সর্বক্ষণের জন্য নাগরিকদের জন্য মুক্ত করে দেওয়া হোক। যেভাবে হাসপাতালগুলি সর্বক্ষণ কর্মব্যস্ত থাকে সেভাবেই যানবাহন, বাজার-হাট ও যাবতীয় কর্মসংস্থান সর্বক্ষণ সক্রিয় থাকুক। তাতে গত প্রায় দেড় বছরে নাগরিকবৃন্দ যে-আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছে তা থেকে কিছুটা উদ্ধারের উপায় মিলবে। তাঁরা সরকারের দেওয়া সাহায্যের প্রত্যাশায় দিনাতিপাত করবে না। আমরা বাঁচতে চাই, কিন্তু শ্রমবিমুখ হয়ে না, বরং উপযুক্ত মর্যাদার সঙ্গে।
দুই, এখন চলছে টিকাকরণের কর্মসূচি। টিকা একটি বিজ্ঞানলব্ধ উপাদান। আমরা এর বিরুদ্ধে না। কিন্তু আমরা বাধ্যতামূলক টিকাকরণের বিরুদ্ধে। আমরা মনে করি, যেকোনও নাগরিকের টিকার গুণ বা অগুণ নিয়ে সবিশেষ জানবার অধিকার আছে; সেই অধিকার থেকে তাকে যেমন বঞ্চিত করা যায় না, তেমনি তার উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জবরদস্তিও করা যায় না।
তিন, ”কোভিড” রোগের চিকিৎসা নিয়ে এবং টিকাকরণ নিয়ে এযাবৎ যত তথ্য সংগৃহীত হয়েছে তা প্রকাশ্যে আনা হোক। সেই তথ্য সংগ্রহের কাজ বলবত থাকুক। এইভাবে জনমানুষ তাঁদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সম্যক বুঝতে পারবেন, দরকারমতো নিজেদের মতামত কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারবেন এবং যথাসময়ে, যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

এই তিনটি আবেদনের সবকটিতে অথবা দুটিতে বা এমনকী, একটিতেও যেসব সংগঠন, সংস্থা বা ব্যক্তিবর্গ আমাদের সঙ্গে সহমত থাকবেন তাঁরাই আমাদের সঙ্গী। আমরা নাগরিকদের সুবিবেচনায় ভরসা রাখি, তাই মনে করি, এই দুঃসময়ে তেমন সঙ্গীর অভাব ঘটবে না।

আসুন, আমরা একটা নতুন পথের সন্ধানে ব্রতী হই, মুক্তমনা হই।